Dhaka ০৩:৩৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২৫, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ইউনূস–নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানে অর্থ লেনদেনে ‘বহুমাত্রিক অনিয়ম’: তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য

ড. মুহাম্মদ ইউনূস

নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও তার নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান—প্রফেসর মোঃ ইউনুস ট্রাস্ট, গ্রামীণ টেলিকম, গ্রামীণ কল্যাণসহ গ্রামীণ পরিবারের একাধিক সংগঠনের আর্থিক লেনদেনে অস্বাভাবিকতা ও অসদাচরণের অভিযোগ পেয়েছে দেশীয় তদন্ত সংস্থাগুলো।

কর দপ্তর, দুদক ও আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের হাতে থাকা নথিপত্র অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠেছে এমন একটি জটিল আর্থিক নেটওয়ার্ক, যার মাধ্যমে বড় অঙ্কের অর্থ বারবার ঘুরিয়ে বিভিন্ন হিসাব ও ট্রাস্টে জমা রাখা হয়েছে।

স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের হিসাবে টাকার ‘ঘূর্ণায়মান’ লেনদেন

২০১৮–২০২২ সময়ে প্রফেসর মোঃ ইউনুস ট্রাস্টের স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক হিসাবে দেখা গেছে—

জমা: ১২৮.৩৯ কোটি

উত্তোলন: ১২৭.৪০ কোটি

স্থানান্তর:

গ্রামীণ টেলিকম ট্রাস্টে ১৭.৩২ কোটি

রূপায়ণ হাউজিংয়ে ১.৬১ কোটি

তদন্ত কর্মকর্তাদের ভাষ্য—ট্রাস্টের নামে বিভিন্ন ব্যাংকে থাকা মোট ১০৩টি এফডিআর ইঙ্গিত দেয়, একই অর্থ একাধিকবার ব্যাংক বদল করে নতুন এফডিআর তৈরি করা হয়েছে; যার উদ্দেশ্য হতে পারে টাকার উৎস ও ব্যয় আড়াল করা।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকেও অস্বাভাবিকতা

একই সময়ে এমটিবির হিসাবে পাওয়া যায়—

জমা: ১২.১ কোটি

উত্তোলন: ১৬.৫৩ কোটি

গ্রামীণ ওয়ান মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ দেখানো হলেও তদন্তকারীদের মতে, এসব লেনদেন “স্বাভাবিক ট্রাস্ট ব্যবস্থাপনার বাইরে”, বরং অর্থ স্থানান্তরের কৌশল হতে পারে।

৪,৯৭৪ কোটি টাকার এফডিআর—কিন্তু প্রতিষ্ঠান ‘অলাভজনক’?

২০২২ সালের জুন পর্যন্ত গ্রামীণ টেলিকম ও গ্রামীণ কল্যাণের নামে মোট এফডিআর ৪,৯৭৪ কোটি টাকা।
এত বিশাল স্থায়ী আমানত থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধারাবাহিকভাবে অলাভজনক দেখানোয় বড় প্রশ্ন উঠেছে।

তদন্ত সংস্থার প্রশ্ন—

লাভ কোথায় গেল?

কর বাঁচাতেই কি লোকসান দেখানো হয়েছে?

শ্রমিক কল্যাণ তহবিলের বাধ্যতামূলক অর্থপ্রদান এড়াতে কি আয়ের হিসাব গোপন রাখা হয়েছে?

দুদক মামলায় ৪৩৭ কোটি টাকার বিতরণ অনুমোদন

দুদকের মামলার নথিতে দেখা যায়—গ্রামীণ টেলিকমের পরিচালনা পর্ষদ সভায় ড. ইউনূসের সভাপতিত্বে ৪৩৭.০১ কোটি টাকা বিতরণের অনুমোদন দেওয়া হয়।

এর মধ্যে—

২৬.২২ কোটি টাকা জমা হয় কয়েকজন কর্মচারী,

এক ইউনিয়ন নেতা

এবং এক আইনজীবীর হিসাবে।

দুদকের অভিযোগ, এটি ছিল পরিকল্পিত বিতরণ প্রক্রিয়া, যা পরে আত্মসাৎ, জালিয়াতি ও অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গের মামলায় রূপ নেয়।

শ্রমিকদের পাওনা আটকে রাখার অভিযোগ

শ্রম আদালতের মামলায় গ্রামীণ টেলিকমের বিরুদ্ধে অভিযোগ—

শ্রমিকদের বৈধ পাওনা দীর্ঘদিন ধরে না দেওয়া

শ্রমিক কল্যাণ তহবিলের অর্থ ইচ্ছাকৃতভাবে পরিশোধ না করা

কর দপ্তরের মামলা: হাইকোর্টের রায় বহাল

ড. ইউনূসের দানকৃত ৭৬.৭৩ কোটি টাকার ওপর ১৫.৩৯ কোটি টাকা কর আরোপ করে কর দপ্তর।
এ বিষয়ে হাইকোর্ট কর আদায়কে বৈধ ঘোষণা করেছে।

গ্রামীণফোন লভ্যাংশে ১০,৮৯০ কোটি টাকার অমিল

গ্রামীণফোন থেকে পাওয়া ১০,৮৯০.১৯ কোটি টাকা লভ্যাংশ গ্রামীণ ব্যাংকের হিসাবে জমা না হওয়াকে তদন্তকারীরা বলছেন “গুরুতর আর্থিক অনিয়মের লক্ষণ”।

বিদেশি রেমিট্যান্সের উৎস নিয়ে অনুসন্ধান

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ওমান, পর্তুগাল, স্পেন, চীন ও জাপান থেকে আসা রেমিট্যান্সের প্রকৃত উৎস ও উদ্দেশ্য জানতে এগমন্ট গ্রুপের সহায়তায় তদন্ত চলছে।

তদন্ত সংস্থার মন্তব্য

এক তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন—
“যা পাওয়া গেছে, তা পুরো চিত্রের একাংশ মাত্র। সম্পূর্ণ নেটওয়ার্ক উন্মোচন করতে আরও তদন্ত প্রয়োজন।”

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয় সংবাদ

ইউনূস–নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানে অর্থ লেনদেনে ‘বহুমাত্রিক অনিয়ম’: তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য

ইউনূস–নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানে অর্থ লেনদেনে ‘বহুমাত্রিক অনিয়ম’: তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য

Update Time : ০৯:৩৭:৩১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২৫

নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও তার নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান—প্রফেসর মোঃ ইউনুস ট্রাস্ট, গ্রামীণ টেলিকম, গ্রামীণ কল্যাণসহ গ্রামীণ পরিবারের একাধিক সংগঠনের আর্থিক লেনদেনে অস্বাভাবিকতা ও অসদাচরণের অভিযোগ পেয়েছে দেশীয় তদন্ত সংস্থাগুলো।

কর দপ্তর, দুদক ও আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের হাতে থাকা নথিপত্র অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠেছে এমন একটি জটিল আর্থিক নেটওয়ার্ক, যার মাধ্যমে বড় অঙ্কের অর্থ বারবার ঘুরিয়ে বিভিন্ন হিসাব ও ট্রাস্টে জমা রাখা হয়েছে।

স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের হিসাবে টাকার ‘ঘূর্ণায়মান’ লেনদেন

২০১৮–২০২২ সময়ে প্রফেসর মোঃ ইউনুস ট্রাস্টের স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক হিসাবে দেখা গেছে—

জমা: ১২৮.৩৯ কোটি

উত্তোলন: ১২৭.৪০ কোটি

স্থানান্তর:

গ্রামীণ টেলিকম ট্রাস্টে ১৭.৩২ কোটি

রূপায়ণ হাউজিংয়ে ১.৬১ কোটি

তদন্ত কর্মকর্তাদের ভাষ্য—ট্রাস্টের নামে বিভিন্ন ব্যাংকে থাকা মোট ১০৩টি এফডিআর ইঙ্গিত দেয়, একই অর্থ একাধিকবার ব্যাংক বদল করে নতুন এফডিআর তৈরি করা হয়েছে; যার উদ্দেশ্য হতে পারে টাকার উৎস ও ব্যয় আড়াল করা।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকেও অস্বাভাবিকতা

একই সময়ে এমটিবির হিসাবে পাওয়া যায়—

জমা: ১২.১ কোটি

উত্তোলন: ১৬.৫৩ কোটি

গ্রামীণ ওয়ান মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ দেখানো হলেও তদন্তকারীদের মতে, এসব লেনদেন “স্বাভাবিক ট্রাস্ট ব্যবস্থাপনার বাইরে”, বরং অর্থ স্থানান্তরের কৌশল হতে পারে।

৪,৯৭৪ কোটি টাকার এফডিআর—কিন্তু প্রতিষ্ঠান ‘অলাভজনক’?

২০২২ সালের জুন পর্যন্ত গ্রামীণ টেলিকম ও গ্রামীণ কল্যাণের নামে মোট এফডিআর ৪,৯৭৪ কোটি টাকা।
এত বিশাল স্থায়ী আমানত থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধারাবাহিকভাবে অলাভজনক দেখানোয় বড় প্রশ্ন উঠেছে।

তদন্ত সংস্থার প্রশ্ন—

লাভ কোথায় গেল?

কর বাঁচাতেই কি লোকসান দেখানো হয়েছে?

শ্রমিক কল্যাণ তহবিলের বাধ্যতামূলক অর্থপ্রদান এড়াতে কি আয়ের হিসাব গোপন রাখা হয়েছে?

দুদক মামলায় ৪৩৭ কোটি টাকার বিতরণ অনুমোদন

দুদকের মামলার নথিতে দেখা যায়—গ্রামীণ টেলিকমের পরিচালনা পর্ষদ সভায় ড. ইউনূসের সভাপতিত্বে ৪৩৭.০১ কোটি টাকা বিতরণের অনুমোদন দেওয়া হয়।

এর মধ্যে—

২৬.২২ কোটি টাকা জমা হয় কয়েকজন কর্মচারী,

এক ইউনিয়ন নেতা

এবং এক আইনজীবীর হিসাবে।

দুদকের অভিযোগ, এটি ছিল পরিকল্পিত বিতরণ প্রক্রিয়া, যা পরে আত্মসাৎ, জালিয়াতি ও অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গের মামলায় রূপ নেয়।

শ্রমিকদের পাওনা আটকে রাখার অভিযোগ

শ্রম আদালতের মামলায় গ্রামীণ টেলিকমের বিরুদ্ধে অভিযোগ—

শ্রমিকদের বৈধ পাওনা দীর্ঘদিন ধরে না দেওয়া

শ্রমিক কল্যাণ তহবিলের অর্থ ইচ্ছাকৃতভাবে পরিশোধ না করা

কর দপ্তরের মামলা: হাইকোর্টের রায় বহাল

ড. ইউনূসের দানকৃত ৭৬.৭৩ কোটি টাকার ওপর ১৫.৩৯ কোটি টাকা কর আরোপ করে কর দপ্তর।
এ বিষয়ে হাইকোর্ট কর আদায়কে বৈধ ঘোষণা করেছে।

গ্রামীণফোন লভ্যাংশে ১০,৮৯০ কোটি টাকার অমিল

গ্রামীণফোন থেকে পাওয়া ১০,৮৯০.১৯ কোটি টাকা লভ্যাংশ গ্রামীণ ব্যাংকের হিসাবে জমা না হওয়াকে তদন্তকারীরা বলছেন “গুরুতর আর্থিক অনিয়মের লক্ষণ”।

বিদেশি রেমিট্যান্সের উৎস নিয়ে অনুসন্ধান

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ওমান, পর্তুগাল, স্পেন, চীন ও জাপান থেকে আসা রেমিট্যান্সের প্রকৃত উৎস ও উদ্দেশ্য জানতে এগমন্ট গ্রুপের সহায়তায় তদন্ত চলছে।

তদন্ত সংস্থার মন্তব্য

এক তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন—
“যা পাওয়া গেছে, তা পুরো চিত্রের একাংশ মাত্র। সম্পূর্ণ নেটওয়ার্ক উন্মোচন করতে আরও তদন্ত প্রয়োজন।”