সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২০, ০৮:৩১ অপরাহ্ন

অনলাইন নির্ভরতা ও বর্তমান প্রজন্ম

স্টাফ রিপোর্ট:
  • আপডেট সময় : ৩ অক্টোবর, ২০২০
  • ২২ বার পঠিত

নজরুল ইসলাম ভুঁইয়া:

করোনা ভাইরাসের কারণে ১৭ মার্চ থেকে বাংলাদেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। দীর্ঘদিন লকডাউনের ফলে ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনার অনেক ক্ষতি হচ্ছে। শিক্ষাব্যবস্থা সচল রাখার জন্য শহরাঞ্চলের প্রায় সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থা চালু হয়েছে। বর্তমানে ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা জুম অ্যাপস, গুগল ক্লাসরুমের মতো বিভিন্ন সাইট ব্যবহার করে ক্লাস করছে। এ ছাড়া সংসদ টিভিও বিভিন্ন শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন বিষয়ে নিয়মিত ক্লাস প্রচার করে যাচ্ছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, কতজন শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাস করার সুযোগ পাচ্ছে এবং তারা কী শিখছে? কারণ, অনেকেরই অনলাইন ক্লাস করার জন্য স্মার্টফোন, কম্পিউটার, ল্যাপটপ নেই। আবার অধিকাংশ শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ভার্চ্যুয়াল শিক্ষা সম্পর্কে কোনো ধারণা ও প্রশিক্ষণ নেই। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাবে অনেক শিক্ষক ক্যামেরা ভীতিতে ভুগছেন ফলে সাবলীল, বোধগম্য ও আকর্ষণীয় লেকচার দিতে পারছেন না। শিক্ষার্থীরাও তাদের সব পড়া সঠিকভাবে বুঝতে পারছে না, আর না বুঝলে শিক্ষকদের কাছে আবার প্রশ্ন করে বুঝে নেওয়ার সুযোগও পাচ্ছে না।

তাই অনেক বিষয়ে পড়াশোনায় ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে। আবার দেশের প্রধান কয়েকটি শহর ছাড়া অন্যান্য জেলায় ইন্টারনেট বা ব্রডব্যান্ড সুবিধা খুব কম। দুর্বল নেটওয়ার্কের কারণে অনলাইনে ক্লাস করার সময় ছাত্রছাত্রীরা শিক্ষকের লেকচার ঠিকমতো দেখতে ও শুনতে পায় না এবং বারবার লাইন কেটে যায় ফলে অনলাইন ক্লাস করতে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। আবার অনেক শিক্ষার্থীর অভিভাবকের কাছে বর্তমান মহামারি পরিস্থিতিতে যেখানে সংসার চালানো মুশকিল, ইন্টারনেটের খরচ বহন করা তাদের জন্য খুব কষ্টসাধ্য। তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, এই অনলাইন ক্লাস করে শিক্ষার্থীদের কতটুকু উপকার হচ্ছে? নাকি ক্ষতিটাই বেশি হচ্ছে? আমরা শিক্ষার্থীদের অল্প লাভের আশায় বেশি ক্ষতি করছি না তো?। কারণ তাদের হাতে এখন আমরাই তুলে দিয়েছি মুঠোফোন, ল্যাপটপ ও কম্পিউটার । এই ডিভাইস শুধু ক্লাসের সময়ে সীমাবদ্ধ নয়। পড়া কালেক্ট করা, হোমওয়ার্ক করা, হোমওয়ার্ক সাবমিট করা, গ্রুপ স্টাডি, এসবের অজুহাতে সারাক্ষণই যেন ইলেক্ট্রনিক্স ডিভাইসের সঙ্গে এরা নিজেকে জড়িয়ে ফেলছে। তারা এক নতুন ভার্চ্যুয়াল জগতে ভেসে বেড়াচ্ছে।

অনলাইন ক্লাসে শিক্ষার্থীরা একই সঙ্গে ক্লাসে থাকছে এবং এর পাশাপাশি অন্য অ্যাপস ব্যবহার করে বন্ধুদের সঙ্গে চ্যাটিং করছে বা মোবাইলে গেম খেলছে কিন্তু তা তাদের শিক্ষকেরা বুঝতেই পারছেন না। অনেকেই বাড়ির কাজ বা শ্রেণি পরীক্ষায় প্রশ্নের উত্তর বন্ধুদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে উত্তর দিয়ে দেয়। সম্পূর্ণ প্রশ্ন না পড়ে একেক বন্ধু একেকটার উত্তর পড়ে এক বন্ধু আরেক বন্ধুকে উত্তর পাঠিয়ে দেয়। এছাড়াও বিভিন্ন অনৈতিকতা ও সন্তানের পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার প্রতিযোগিতায় পিতা-মাতাও লিপ্ত থাকে।

পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার জন্য পিতা-মাতাই রাতের আঁধারে প্রশ্ন ফাঁস চক্র খুঁজে। আমার অতি পরিচিত কিছু ছোট ভাইয়ের কাছে শুনেছি, বর্তমান এই করোনা কালীন সময়ে বিভিন্ন নামীদামি স্কুল-কলেজ গুলো যখন হোয়াটসঅ্যাপ সহ বিভিন্ন অ্যাপসের মাধ্যমে পরীক্ষা নিচ্ছে। এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর পিতা-মাতাই সন্তানকে সব কিছু লিখে দিচ্ছে। আবার কিছু পিতা-মাতা বাসার শিক্ষকের হাতে পায়ে ধরে সন্তানের পরীক্ষার সকল প্রশ্নোত্তর শুদ্ধরূপে লিখে শতভাগ নম্বর নিশ্চিত করে। চট্টগ্রামের বিভিন্ন নামীদামী স্কুল-কলেজে পড়ুয়া আমার অনেক পরিচিত শিক্ষার্থী আছে।

আমি এমনও দেখেছি, সন্তান একটি মোবাইলে পরীক্ষা দিচ্ছে, সেখান থেকে প্রশ্নের স্ক্রিনশট নিয়ে বাসার শিক্ষকের মোবাইলে পাঠিয়ে তার সমাধান করে নেন। আর এই অনৈতিক কাজের উৎসাহদাতা পিতা-মাতা নিজেই। পিতা মাতাই শিক্ষককে আগে থেকেই কনভিন্স করে নেয়। একটা সময় আমরা কিছু না পারলে বই থেকে তার উত্তর খুঁজতাম, এখনকার শিক্ষার্থীরা গুগলে উত্তর খুঁজে। অনেক শিক্ষার্থীকে দেখেছি নিজে বই থেকে কোনো কিছু খুঁজে বের না করে, বন্ধুদের থেকে নোটের ছবি নেয়, আবার সেই নোট খাতায় না লিখে মোবাইলে রেখেই তা পড়ে। এতে করে শিক্ষার্থীরা খুব বেশি অলস হয়ে যাচ্ছে। প্রযুক্তি আমাদেরকে অগ্রসর করার পাশাপাশি আমাদেরকে বিকলাঙ্গ করে গড়ে তুলছে।

এছাড়াও অনলাইন ক্লাসে শিক্ষার্থী কী শিখছে, তা পরীক্ষার মাধ্যমে মূল্যায়ন সঠিকভাবে হচ্ছে না। তাই পড়াশোনার প্রতি গুরুত্ব কমে যাচ্ছে। অনলাইন ক্লাস করার জন্য বিভিন্ন ডিভাইসের স্ক্রিনের সামনে দীর্ঘ সময় বসে থাকায় ছাত্রছাত্রীদের চোখে সমস্যা, মাথাব্যথা, ঘাড়ে ও পিঠের মেরুদণ্ডে ব্যথা হচ্ছে। যা দীর্ঘ সময় চলতে থাকলে বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। ছোট ছোট শিশুরা অনলাইন ক্লাসের কারণে সোশ্যাল মিডিয়ার সঙ্গে নতুন করে পরিচিত হচ্ছে, যা তাদের বয়সের সাথে খাপ খায় না।

সময়ের আগে কোনো কিছুই ভালো না জেনেও আমরাই আজ তাদের হাতে এগুলো তুলে দিচ্ছি, যা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতির কারণ হবে। শিক্ষার্থীরা যেন অতিরিক্ত অনলাইন আসক্ত না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে প্রযুক্তি আমাদের জীবনে যাতে অভিশাপ না হয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


এই রকম আরো সংবাদ

আর্কাইভ

SatSunMonTueWedThuFri
     12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31      
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031   
       
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
29